চুল কেন পড়ছে এবং এর সমাধান কি (Hairfall solution)




বর্তমান যুগে মাথার চুল পড়া বিষয়টি খুব সাধারণ একটি সমস্যা হয়ে দাড়িয়েছে। ২০ থেকে ৩০ বছর বয়স  এমন বেশির ভাগ ছেলে বা মেয়েদের মাঝে এই সমস্যাটি নিয়ে বেশ উদ্বিগ্ন থাকতে দেখা যায় কারণ চুল একজন মানুষের বাহ্যিক সৌন্দর্য বাড়াতে যথেষ্ট ভূমিকা রাখে। অথচ আমাদের বাবা-চাচা বা আমাদের দাদা-দাদীর সময়ে তারা কিন্তু এ নিয়ে খুব একটা সমস্যায় ছিলেননা। কারণ তাদের সময়ে এ ধরনের সমস্যা গুলো খুব একটা দেখা যেতনা। প্রশ্ন জাগতে পারে তাহলে এখন কেন এ সমস্যাটা আমাদের মাঝে এত বেশি দেখা যাচ্ছে ? সত্যি কথা বলতে বিজ্ঞান এখনো এটা নিয়ে গবেষণা করেয় যাচ্ছে এবং সুনির্দিষ্ট কোন কারণ খুজে বের করতে পারেনি। তবে কিছু কিছু বিষয় ধারণা করা হয় যার মধ্যে অন্যতম হল আমাদের লাইফস্টাইল এবং খাদ্যাভাসে বিরাট অনিয়ম। যেমন,আমাদেরকে এখন রাতে অনেক দেরি করে ঘুমাতে যেতে হয়, সকালবেলা না খেয়ে কাজের উদেশ্যে বেরিয়ে পড়তে হয় এবং মিনিমালিস্ট হতে গিয়ে আমরা অনেক বেশি ফাস্টফুডে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। এছাড়াও অতিমাত্রাই পলিউশন বা দূষণও চুলের এই ধরনের (চুল পড়া) সমস্যা গুলোর জন্য অনেক সহায়ক ভূমেকা পালন করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আজকে আমি চুল পড়ার এই বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত কিছু লিখার চেষ্টা করব এবং ক্লিনিকালি Aprooved কিছু সলিউশন দেবার চেষ্টা করব।



বলে রাখা ভালো যে আমাদের দেশের বিভিন্ন ওয়েবসাইট বা ইউটিউব চ্যানেলে চুল পড়া রোধ এমনকি নতুন চুল গজানোর জন্য বিভিন্ন টোটকা চিকিৎসা বা তেল ব্যবহার করার কথা বলা হয়ে থাকে যেগুলোর কোন সায়েন্টিফিক ব্যাক্ষা নেই।কারণ তেল ব্যাবহার করে যদি চুল পড়া রোধ করা যেত তাহলে সারা পৃথিবীতে কোন টাক মাথার লোক খুজে পাওয়া যেত না।



চুল কেন পড়ে সমাধান সহ


চুল পড়া রোধ করবার জন্য যে বিষয়টা সবচেয়ে আগে খতিয়ে দেখা গূরুত্বপূর্ণ তা হল আপনার চুল ঠিক কি কি কারণে পড়ে যাচ্ছে।কারণ তাহলে এ সমস্যাকে ক্লিনিকালি সমাধান করা সম্ভব।বিভিন্ন গবেষনায় এ নিয়ে বিভিন্ন তথ্য ঊঠে এসেছে।


অতিরিক্ত দুশ্চিন্তাঃ অনেকেই আছেন যারা অতি মাত্রায় দুশ্চিন্তা করে থাকেন কিন্তু এটায় বাস্তবতা যে দুশ্চিন্তা কখনো কোন নেগেটিভ রেজাল্টকে পজিটিভে রূপ দিতে পারেনা। অর্থাৎ যা হবার তা হবেয় আপনি দুশ্চিন্তা করে একে আটকাতে বা এড়িয়ে যেতে পারবেন না।
অনেক সময় চুল পড়া নিয়েও অনেকের মাঝে দুশ্চিন্তা ভাব দেখা যায় যার ফলে চুল পড়ার মাত্রাটাও বেড়ে যেতে পারে তাই দুশ্চিন্তাকে ছুটি দিয়ে দিন। শুধু চুল পড়া নয় বেশ কিছু রোগ আছে যেগুলো দুশ্চিন্তা বা স্ট্রেচ নেবার কারণে হয়ে থাকে যেমন,হাই-ব্লাড প্রেসার, হেডেক (মাথা ব্যাথা) ইত্যাদি।


এলোপেসিয়া এরিয়েটাঃ



কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায় যে কিছু কিছু মানুষের চুল মাথার একটি নির্দিষ্ট এলাকা জুড়ে গোল হয়ে ঊঠে যায় একে বলা হয় এলোপেসিয়া এরিয়েটা । এটা আসলে কেন হয় এর সঠিক কারণ এখনো জানা যায় নি।তবে আপনারা জেনে থাকবেন যে সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে এই রোগটি এখন পুরপুরি প্রতিকার করা সম্ভব হচ্ছে।
অনেক সময় পেয়াজের রস এই রোগের জন্য পুরোপুরি না হলেও বেশ ভালো ফলাফল দিয়ে থাকে। তবে একজন ডার্মাটোলজিস্টের পরামর্শ অবশ্যই নেয়া জরুরী।


বিভিন্ন অসুখ এবং খুশকিঃ 




অনেক সময় বিভিন্ন অসুখ থেকে সেরে উঠবার পর ( যেমন, টায়ফয়েড) হঠাৎ করে hairfall বেড়ে যায়। এছাড়াও যারা ক্যান্সারের জন্য বিভিন্ন ড্রাগস নিয়ে থাকেন তাদেরও ড্রাগস নেওয়াকালীন সময়ে ব্যাপক পরিমাণে চুল পড়ে যায়।
মহিলাদের ক্ষেত্রে প্রেগ্নেন্সি পরবর্তীকালীন সময়েও এই একই ধরনের চুল পড়ে যাবার ঘটনা ঘটে এবং এটা প্রায় ১ থেকে ১.৫ বছর পর্যন্ত নিয়মিত পড়তে থাকে।
আবার অনেকেরই বর্ষাকাল বা শীতকালে হঠাৎ করেই চুল পড়া বাড়ে (এটা হয়ে থাকে ঋতু পরিবর্তন হবার জন্য)।
এই চুল পড়ে যাওয়া বা হেয়ারলসের ঘটনা গুলো টেম্পোরারি ঘটে থাকে এবং কয়েকমাস পরে এই চুল গুলো আবার জন্মাবে/ফিরে আসবে। সে জন্য এই সকল ক্ষেত্রে হেয়ার লসের ঘটনা ঘটলে আতংকিত হবার কিছু নেই।

খুশকি চুলের অন্যতম প্রধান শত্রু। এর কারণে মাথার ত্বকে ইনফেকশন পর্যন্ত হয়ে যায় এবং চুল পড়তে সাহায্য করে।কিন্তু এটা পুরোপুরি নির্মুল করা সম্ভব না। শ্যাম্পু ব্যবহারের মাধমে একে কন্ট্রলে রাখা যায় মাত্র।
তাহলে কোন শ্যাম্পু চুলের জন্য ব্যবহার করবেন? সান্সিল্ক নাকি ডাভ নাকি ক্লিয়ার!! আসলে বাস্তবতা হল আমাদের দেশে যে শ্যাম্পু কম্পানিগুলোর বিজ্ঞাপন টিভিতে বেশি দেখা যায় এগুলো খুব একটা আশানোরূপ ফল দিতে পারেনা।
এর জন্য বিদেশী শ্যাম্পু গুলো আমরা ব্যবহার করতে চাই কিন্তু অরিজিনাল বিদেশী শ্যাম্পু এখন চেনাটাও একপ্রকার দায়। কারণ চকবাজারে শ্যাম্পু তৈরী হচ্ছে আর এর মোড়ক তৈরী হয়ে আসছে চায়না থেকে যার মোড়ক হুবহু অরিজিনাল শ্যাম্পুর মত। তাই এখন ভরষা হচ্ছে কিটোকোনাযল  সমৃধ্ব বা খুশকির জন্য মেডিকেল সাইন্স aprooved শ্যাম্পু গুলো। এই শ্যাম্পু গুলো খুব কম সময়ে খুব ভালো ফলাফল দিয়ে থাকে এবং চুল পড়া কমায়। এমন একটি শ্যাম্পু হল nizoder 2%. বাংলাদেশী  এক্সপার্টরা খুশকি সমস্যা দূর করতে এটি ব্যবহারের পরামর্শ দিয়ে থাকেন। যদিও এগুলোর তেমন কোন পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া নেই  কিন্তু তারপরেও ব্যবহারের পূর্বে  অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া এই শ্যাম্পু গুলোর দিকে ঝুকে যাওয়াটা বোকামী হবে কারণ এগুলো ঔষুধো বটে।


এড্রোজেনেটিক এলোপেসিয়াঃ 



প্রথমত, মাথার সামনের দিকে চুল এবং কপাল মিলিয়ে একটি 'M' শেপের মত তৈরী হয়। সময়ের সাথে ধীরে ধীরে চুল অনেক পাতলা হয়ে যায় এবং একসময় মাথার সামনের দিকের এবং পেছনের দিকের ওপরের অংশের প্রায় চুলই পড়ে যায় (যদিও দুই পাশের চুল ঠিকই থাকে)। এই ধরনের চুল পড়া সাধারণত ঘটে থাকে বংশীয় কারণে। বাবা অথবা মায়ের বংশে এ ধরনের জেনিটিক এলোপেসিয়া থাকলে এক সময় চুল অবশ্যই পড়ে যাবে এবং এটা খুব স্বাভাবিক ঘটনা । এটা নিয়ে দুশ্চিন্তার কিছু নেই।
তবে মেডিকেল সাইন্সের কল্যাণে এই ধরনের সমস্যাও এখন সমাধানযোগ্য। এর জন্য মিনক্সিডিল লোশন এবং ফিনাস্টেরাইড (Finasteride) পিল বেশ কার্যকরি ভূমিকা রাখে। উল্লেক্ষ্য যে মিনক্সিডিল হচ্ছে একমাত্র FDA(USA Food and Drug Administration ) aprooved লোশন যা চুল পড়া রোধ করে এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে চুলের ঘনত্ব বাড়ায়। অন্যদিকে ফিনাস্টেরাইডও চুল পড়া রোধ করে এবং ঘনত্ব বাড়াতে সহায়তা করে তবে এর বেশ কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রীয়া রয়েছে (যেমন, এলার্জি)।
তবে সবক্ষেত্রে এই মেডিসিন গুলো পজেটিভ রেজাল্ট নাও দিতে পারে ( যদিও সারা বিশ্বব্যাপী এগুলো অনেক জনপ্রিয়)। কারণ এগুলো অনেক লম্বা সময় ধরে সেবন করতে হয় এবং একটা বড় সমস্যা হচ্ছে যত দিন মেডিকেশন চলবে তত দিন চুল পড়বেনা মেডিকেশন বাদ দিলে আবার নতুন করে চুল পড়তে শুরু করবে ( বংশীয় এলোপেসিয়ার ক্ষেত্রে)।
সে ক্ষেত্রে বর্তমানে hair transplant/restore করা হচ্ছে । তবে এটা যেমন ফলোপ্রশু তেমনি অনেক ব্যয়বহুল এবং সময়সাপেক্ষ ব্যাপার।
তবে PRP (Platelet Rich Plasma) থেরাপির সাহায্যে খুব কম খরচে এখন hair regrow করানো সম্ভব হচ্ছে । আর আশার কথা হচ্ছে এই সবকিছুই এখন বাংলাদেশে শুরু হয়েছে।



চুলের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে


১। সপ্তাহে সর্বোচ্চ ২ বার চুলে শ্যাম্পু ব্যবহার করুন,অতিরিক্ত শ্যাম্পু চুলের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।
২। চুলে হিট দেবেন না এতে চুল দুর্বল হয়ে ভেঙ্গে যায়।
৩। পার্লারের হেয়ার কস্মেটিক্স গুলো এড়িয়ে চলার চেষ্টা করুন কারণ আপনি জানেন না আপনি কি দিচ্ছেন আপনার        চুলে।
৪। ডায়েট করার সময় প্রোটিনের দিকে খেয়াল রাখবেন কারণ চুল কেরাটিন(প্রোটিন)। তাই চুলের স্বাস্থ্য ভালো                রাখতে প্রোটিন খুব গূরুত্বপূর্ন।
৫। প্রতিদিন ১০০-১৫০ চুল পড়া ন্যাচারাল ঘটনা তাই চিন্তিত হবেন না।
৬। ভাজা-পোড়া এভোয়েড করুন। সুষম খাবার খান এবং সম্ভব হলে ডিম, দুধ, পালংশাক,বিভিন্ন বাদাম, মিষ্টি                আলু,দই ,ওটমিল এবং এন্টিওক্সিডেন্ট আছে এমন খাবার বেশি পরিমাণে খেতে পারেন।
৭। নিয়মিত ব্যায়াম করুন। এটি হার্ট এবং হেয়ার উভয়ের জন্যই ভালো।


চুল পড়া এবং এর সমাধান নিয়ে খুব সংক্ষিপ্ত আকারে লিখার চেষ্টা করেছি, এ নিয়ে যে কোন মতামত, সাজেশন অথবা ভুলভ্রান্তি বুঝতে পারলে অবশ্যই কমেন্টে/মেসেজে জানাবেন।
লিখাটি পড়ার জন্য ধন্যবাদ।
চুল কেন পড়ছে এবং এর সমাধান কি (Hairfall solution) চুল কেন পড়ছে এবং এর সমাধান কি (Hairfall solution) Reviewed by Rone Ahmed on December 28, 2017 Rating: 5

No comments:

Powered by Blogger.